ড. আখতার হামিদ খানের কালোত্তীর্ণ পল্লী উন্নয়ন আদর্শ
বাংলাদেশসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল অনেক দেশেই পল্লী উন্নয়নের প্রবাদ পুরুষ ও পথিকৃৎ হিসাবে স্বীকৃত ড. আখতার হামিদ খান ১৯১৪ সালের ১৫ জুলাই ভারতের উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত আগ্রায় এক পাঠান বংশে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর লন্ডনে। আজ তার ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। উন্নয়ন কর্মী, অ্যাক্টিভিস্ট সমাজ বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক ও প্রশাসকসহ তাঁর পরিচয় বহুমাত্রিক অর্থ্যাৎ তিনি ছিলেন ভার্স্যাটাইল জিনিয়াস। জন্মসূত্রে অবাঙালি হওয়ার পরও তিনি বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে আধুনিকতা আনয়নের পথ-প্রদর্শক। তার দর্শনের আলোকে গ্রামভিত্তিক বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়ন তথা পল্লী উন্নয়নের আধুনিক ধারণার জন্ম হয়। এই ধারণা বাস্তবায়নের অন্যতম বাহন ছিল দ্বি-স্তর বিশিস্ট সমবায় সমিতি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক সমিতিগুলোর সমন্বয়ে আবশ্যিকভাবে থাকবে থানা-উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি। এই দুটি পর্যায়ের সমিতি হবে একে অপরের পরিপূরক ও সম্পুরক।
সমবায় সমিতি আইন ২০০১ (সর্বশেষ সংশোধিত ২০১৩) এর ৮(চ) উপধারা অনুযায়ী, ‘দ্বি-স্তর বিশিস্ট সমবায় সমিতি অর্থ্যাৎ গ্রাম পর্যায়ে গঠিত কমপক্ষে ১০ (দশ) টি প্রাথমিক সমবায় সমিতির সমন্বয়ে উপজেলা বা থানা পর্যায়ে গঠিত উপজেলা/থানা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি লিমিটেডকে বুঝাইবে।’ সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, সমবায় অঙ্গনে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি, পারস্পরিক সহায়তার বন্ধন স্থাপন ও কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির মাধ্যমে। এটাই দ্বি-স্তর সমবায় সমিতির মুল কথা। আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর সুশাসন অর্থ্যাৎ সততা, ন্যয্যতা, দক্ষতা, জবাবদিহিতার নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে তহবিল সংগ্রহ ও সদস্য প্রথমিক সমিতিসমূহের উৎপাদনমুখি প্রকল্পে তহবিল বিনিয়োগ ও সমবায়ীদের নির্ভরযোগ্য অর্থ সরবারহকারী, সমন্বয় সৃষ্টিকারী, এবং দক্ষতা বৃদ্ধিকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির মুখ্য উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে পল্লী। গ্রাম ও গ্রামাঞ্চল সমন্বয়ে যে ইকো সিস্টেম গড়ে ওঠে তাকে আমরা বলি পল্লী। দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে এবং এভাবেই এই পল্লী কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, কুটির শিল্প ও পল্লীস্থ স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বিশৃঙ্খল ও অনিশ্চিত বিশ্বের মাঝে বাংলাদেশে আমাদের টিকে থাকার ভরসা হচ্ছে পল্লীকেন্দ্রিক অর্থনীতি। এই প্রেক্ষাপটেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও জনকল্যাণমুখি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান বিএনপি সরকার দেশের প্রতিটি মানুষকে উন্নয়নের ধারা উপধারা-উপধারায় সম্পৃক্ত করতে চায়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে গ্রাম ও পল্লীকেই জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করছে এ সরকার। এগুলো ছাড়া প্রত্যাশিত নূতন বাংলাদেশ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ড. আখতার হামিদ খান সূচিত পল্লী উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করতে হবে। কেননা ড. আখতার হামিদ খাঁনের প্রতিষ্ঠিত আদর্শ অনুযায়ী পল্লী উন্নয়ন বিষয়টি এক বা একাধিক খাতভিত্তিক ক্ষেত্রে নয়; বরং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়ন ডেভেলপমেন্ট কনসেপ্টের বিষয়টি মূলত একটি সমন্বিত রূপ।
পল্লী উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রাতঃস্মরণীয় ড. আখতার হামিদ খান ভারতের আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় হতে শিক্ষালাভ করে; তৎকালিন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) শিক্ষানবীস কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেন। শিক্ষানবীসকালীন সময়েই তিনি যুক্তরাজ্যের ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য ও ইতিহাসে অধ্যয়ন করেন। তিনি মূলত: ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। ক্যাম্ব্রিজ থেকে অধ্যয়ন শেষে দেশে ফিরে আসলে তাঁর পোস্টিং হয় তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন মহকুমায়। প্রথম পোস্টিং ছিল তৎকালীন ত্রিপুরা জেলায়। ১৭৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ত্রিপুরা জেলার সদর দপ্তর ছিল কুমিল্লাতে। সূতরাং গর্বের সঙ্গে বলা যায় যে, ঐতিহ্যবাহী আইসিএস অফিসার হিসাবে ড. আখতার হামিদ খানের প্রথম পোস্টিং ছিল বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায়। ১৯৪৩ সালের মহা মনন্তরের সময় ড. আখতার হামিদ খান তৎকালীন নেত্রকোনা মহকুমার প্রশাসক ছিলেন। এখান থেকে ব্রিটিশ শাসকদের রক্তচক্ষুকে অবজ্ঞা করে এবং বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের প্রতি অকৃত্রিম মমতা দেখিয়ে তিনি সে সময়ের সবচেয়ে দামি আইসিএস এর চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। চাকরি পরিত্যাগ করেই চলে যান ভারতের আলীগড়ের কাছে ‘মামুল’ নামক একটি গ্রামে। সেখানে তিনি প্রধানত কৃষিকাজ শুরু করেন; স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের অসহযোগিতায় ‘মামুল’ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তবে প্রাণ দিয়ে উপলদ্ধি করে বাস্তব অভিজ্ঞতার ঝুলিতে করে নিয়ে আসেন ভারতবর্ষের কৃষকদের বহুমাত্রিক সমস্যা।
ড. আখতার হামিদ খান চাকরি ইস্তফা দিয়ে ভারতে নানা অঞ্চলে তালা-চাবি মেরামতের কাজসহ অনেক কাজে সম্পৃক্ত থেকে মননে-মগজে সমাজের মানুষের মন-মানসিকতা সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা করেছেন। তিনি একটি মাদ্রাসারও নিবেদিত শিক্ষক হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেন। এভাবে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৫০ সালে তিনি চলে আসেন কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ্য হিসাবে। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বাংলায় সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন কাজে মনোনিবেশ। ১৯৫৪ সালে সরকার তাকে ‘ভিলেজ এগ্রিকালচারাল এণ্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট (ভি-এইড)’ প্রোগ্রামের পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়। সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন সংক্রান্ত তার চিন্তা ভাবনার বিকাশ ও পরিপক্কতা এখন থেকেই শুরু হয়। ভি-এইড প্রোগ্রাম সফল না হলেও ড. খান সফল হয়েছেন। ভিলেজ এইড কর্মসূচিতে থাকা অবস্থায় তিনি সেখানে নূতন নূতন মাত্রা যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ শেষ করেই ১৯৫৯ সালে বর্তমান বার্ড-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসাবেই সূচিত করেন ৪টি কর্মসূচি। যথা—
১. থানা ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (টিটিডিসি);
২. পল্লীপূর্ত কর্মসূচি;
৩. থানা সেচ প্রকল্প; এবং
৪. দ্বি-স্তর সমবায় ব্যবস্থা।
উল্লেখ্য, উক্ত ৪টি কর্মসূচির সমন্বিত রূপই পল্লী উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প; যা (কুমিল্লা মডেল) নামে বিশ্বখ্যাত। আরও উল্লেখ্য উক্ত ৪টি কর্মসূচির আলাদা আলাদা অস্তিত্ব না থাকলেও ৪টি কর্মসূচি/প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে বৃহাদাকার ৪টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেমন— টিটিডিসি-এর ওপর ভিত্তি করে উপজেলা কাঠামো। পল্লী পূর্ত কর্মসূচি হয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল ডিপার্টমেন্ট। থানা সেচ প্রকল্পের ধারণা নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে-বিএডিসি এবং দ্বি-স্তর সমবায় ব্যবস্থা সংবলিত সমন্বিত প্রকল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড বা বিআরডিবি।
এ প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে, যেসকল কারণে ড. আখতার হামিদ খান তথা কুমিল্লা মডেল এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক তার কারণ হচ্ছে;
প্রথমত: ড. আখতার হামিদ খানের ব্রেইন-চাইল্ড কুমিল্লা মডেলের ৪টি কম্পোনেন্ট নিয়ে গড়ে উঠেছে মহীরুহু ৪টি প্রতিষ্ঠান।
দ্বিতীয়ত: ড. আখতার হামিদ খান উদ্ভাবিত ও প্রয়োগকৃত মডেলসমূহে যে সকল গুরুত্বপূর্ণ কম্পেনেন্ট ছিল সেগুলো এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ; বিকেন্দ্রিকৃত স্তরে এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ; মানবসম্পদের উন্নয়ন; জেন্ডার সমতা; নারীদের ক্ষমতায়ন; পরিবার পরিকল্পনা; স্থানীয় সম্পদের ও সংস্থান ও সদ্ব্যবহার, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের কার্যকর সমন্বয়মূলক সম্পর্ক, ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রম।
তৃতীয়ত: প্রতিটি কাজের জবাবদিহিমূলক মনিটরিং ব্যবস্থা;
চতুর্থত: তার প্রতিটি উদ্যোগই প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছিল। এ কারণে তার গৃহীত ছোট-বড় সকল প্রকল্পই বাস্তবভিত্তিক প্রাক্কুলিত ব্যয়, সঠিক বাস্তবায়ন এবং কাঙ্খিত উপকার লাভের ক্ষেত্রে অনেকটাই নিশ্চিত হতো; যা দেশের সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য এখন খুব প্রযোজ্য।
প্রসঙ্গত: বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে পরিচিত কৃষিক্ষেত্রে ড. আখতার হামিদ খানের অবদানগুলো হচ্ছে—
১. লাইন ধরে ধান চাষের পদ্ধতি তিনিই প্রথম কৃষকদের শিখিয়েছেন;
২. অধিক শস্য ফলনের জন্য ইরি ধানের বীজ তিনিই প্রথম বিদেশ থেকে আমদানী করেন;
৩. দেশে লো-লিফ্ট পাম্পের পাশাপাশি তিনিই গভীর নলকূপের মেশিন আমদানী করেন;
৪. জাপানী বিশেষজ্ঞদের সহয়তায় তরমুজ, উন্নত চীনা কপি, গাজর ইত্যাদির উৎপাদন ব্যবস্থার সূচনা করেন।
এজন্য ড. আখতার হামিদ খান শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও কর্ম ও আদর্শগুণে তিনি অমর হয়ে আছেন। আবার বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ক্ষেত্রে ড. খানের প্র্যাক্টিস ও আদর্শ অনুসরণের যেহেতু কোনো বিকল্প নেই, সেহেতু তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমরা শুধু তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাতই কামনা করবো না; বরং একইসঙ্গে তাঁর উদ্ভাবিত পল্লী উন্নয়ন মডেল বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবো।
