পোশাকের বাইরে রপ্তানি বাড়াতে ১৮ বাজারে ৫৪ পণ্যের কৌশল
বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও বড় ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি করে রেখেছে তৈরি পোশাকের ওপর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসার সম্ভাবনা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের প্রয়োজনীয়তা সামনে রেখে এবার পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যকরণে বড় পরিকল্পনা করছে সরকার।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ১৮টি রপ্তানি গন্তব্যে ৫৪টি পণ্যের সম্ভাবনা যাচাই করে পৃথক রপ্তানি কৌশল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন বাজারে বাংলাদেশের কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান কী, প্রতিযোগী দেশগুলো কীভাবে এগিয়ে আছে এবং বাজার দখলে কী ধরনের নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন, তা বিশ্লেষণ করে দেশভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজিকে একটি অঞ্চল ধরে ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান, কানাডা ও বেলজিয়ামকে এ পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া হয়েছে।
যে ৫৪ পণ্যে নজর
সরকারের সম্ভাবনাময় পণ্যের তালিকা বেশ বিস্তৃত। তৈরি পোশাকের নিট ও ওভেন পণ্যের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ব্যাগ ও ভ্রমণসামগ্রী, বস্ত্র, হোম টেক্সটাইল ও হোম ডেকরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর বাইরে ওষুধ, আসবাব, খেলনা, ক্রীড়া সামগ্রী, সাইকেল, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক, ধাতব গৃহস্থালি সামগ্রী, লোহা ও ইস্পাতও তালিকায় রয়েছে।
কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় সম্ভাবনা। মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক, ফলমূল ও সবজি, ফল ও বাদাম, প্রক্রিয়াজাত ও হালাল খাদ্য, ভোজ্যতেল, চা, পানীয় এবং পোষা প্রাণীর খাদ্য ও সামগ্রীও সম্ভাবনাময় পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
কেন এখন বাজার বৈচিত্র্য জরুরি
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ইবিএ ও জিএসপির আওতায় পাওয়া সুবিধাগুলো ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কর্মশালায় ২০২৯ সালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যদিও এই সময় পরিবর্তন হতে পারে।
এই অবস্থায় তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই পাট, চামড়া, সামুদ্রিক খাদ্য, ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশল খাতকে সামনে এনে রপ্তানির নতুন ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছে সরকার।
বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান বলেছেন, দেশের রপ্তানিকে শক্তিশালী ও টেকসই করতে পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যকরণে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচিত বাজারগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশভিত্তিক প্রোফাইল এবং বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল তৈরির কাজ চলছে।
বড় বাজার, কিন্তু বাংলাদেশের অংশ খুবই কম
বিশ্বের বড় বড় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমান রপ্তানি সেই সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম।
যুক্তরাষ্ট্রের আসবাবের বাজার-এর একটি বড় উদাহরণ। দেশটি বছরে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের আসবাব আমদানি করলেও বাংলাদেশ থেকে যায় মাত্র ৫৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য। একইভাবে প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি ডলারের খেলনার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৫৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
যুক্তরাজ্যে ওষুধ আমদানির বাজার প্রায় ২ হাজার ৭৬৬ কোটি পাউন্ডের। সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ২৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড। ফ্রান্সে চামড়া, ব্যাগ ও জুতার আমদানি প্রায় ১ হাজার ৫৪৮ কোটি ডলার হলেও বাংলাদেশ সেখানে রপ্তানি করছে ২১ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য, যা বাজারটির প্রায় ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অর্থাৎ বাজারের আকার বড় হলেও বাংলাদেশের উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রান্তিক। সরকারের নতুন কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হলো এই ব্যবধান কমানো।
বাজারভেদে আলাদা কৌশল
একই পণ্য সব বাজারে সমানভাবে সফল হবে না। তাই বাজারভেদে পণ্য নির্বাচন ও কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে।
চীন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াকে প্রথম স্তরের বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-ফিজি, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে দ্বিতীয় স্তরে। রাশিয়া, তুরস্ক, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইরানকে রাখা হয়েছে তৃতীয় স্তরে।
এই বিভাজনের ভিত্তিতে প্রতিটি বাজারে সম্ভাবনাময় পণ্য, বিদ্যমান রপ্তানি, প্রতিযোগী দেশ এবং প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা বিশ্লেষণ করে আলাদা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে।
চীন-ভারত বড় প্রতিদ্বন্দ্বী
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগিতার চিত্রও উঠে এসেছে বিশ্লেষণে। ১৮টি বাজারের সবকটিতেই চীন বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভিয়েতনাম ১৪টি বাজারে এবং ভারত ১১টি বাজারে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
চীনের বড় উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা ও প্রতিযোগিতামূলক দাম বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ভিয়েতনামও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যে দ্রুত বাজার বাড়িয়েছে। ভারতের রয়েছে ভৌগোলিক সুবিধা, বৃহৎ উৎপাদনভিত্তি এবং অনেক বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক।
ফলে শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করে এসব বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করা কঠিন হবে। পণ্যের মান, নকশা, সময়মতো সরবরাহ, সনদ এবং ব্র্যান্ডিংয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।
সনদ ও মান নিয়ন্ত্রণ বড় বাধা
রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা আন্তর্জাতিক মান ও সনদ পাওয়ার সক্ষমতা। বিভিন্ন বাজারে পণ্যের জন্য আলাদা মানদণ্ড ও অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
পরিকল্পনায় লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ, ইউরোপের রিচ বিধিমালা, খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা মান, ওষুধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ, যুক্তরাজ্যের এমএইচআরএ এবং অস্ট্রেলিয়ার টিজিএসহ প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক অনুমোদন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে হালাল সনদ, আধুনিক পরীক্ষাগার ও মান যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। রপ্তানিকারকদের জন্য এসব সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা না গেলে সম্ভাবনাময় বাজারেও প্রবেশ কঠিন হবে।
অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যয়েও পিছিয়ে বাংলাদেশ
রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের আরেকটি বড় বাধা লজিস্টিকস। পণ্য উৎপাদনের পর তা নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতার হাতে পৌঁছানো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানের বাজারে বাংলাদেশ থেকে পণ্য পৌঁছাতে ৭৫ থেকে ১১৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। চীনের ক্ষেত্রে সময় লাগে প্রায় ১৮ থেকে ৩৭ দিন। দীর্ঘ পরিবহন সময় ও বেশি ব্যয় বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
ভারতের স্থলবন্দর ব্যবহারেও সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিধিনিষেধ রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে বন্দর, কাস্টমস, স্থল ও সমুদ্রপথ এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া নতুন বাজারে বড় পরিসরে রপ্তানি বাড়ানো কঠিন।
আলাদা বাজারে আলাদা ঝুঁকি
সব বাজারের প্রতিবন্ধকতাও এক নয়। ইরানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং জটিলতা বড় সমস্যা। ব্রাজিলের বাজারে পাট রপ্তানিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক রয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রে পণ্যের মান ও পারস্পরিক স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। চীনে খাদ্যনিরাপত্তা ও পণ্য অনুমোদনের শর্ত বড় বিষয়। ইউরোপীয় বাজারে পরিবেশ, রাসায়নিক ব্যবহার ও পণ্যের মানসংক্রান্ত বিধিমালা কঠোর।
ফলে প্রতিটি বাজারে একই ধরনের কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক উদ্যোগ কার্যকর হবে না। বাজারভিত্তিক নীতি গ্রহণই হবে সরকারের নতুন কৌশলের মূল বিষয়।
দেশের ভেতরেও বড় সংস্কারের পরিকল্পনা
রপ্তানি বাড়ানোর কৌশলে শুধু বিদেশি বাজারে প্রচারণার ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না। দেশের উৎপাদনব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পণ্যের বৈচিত্র্য ও নকশা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সনদ নিশ্চিত করা, হিমাগার ও পরীক্ষাগার তৈরি, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর এবং এপিআই শিল্পপার্ক স্থাপনের মতো উদ্যোগ পরিকল্পনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ প্রচার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ এবং বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেও জোর
সরকার বাজার সম্প্রসারণে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক উদ্যোগ বাড়াতে চায়। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ দ্রুত চূড়ান্ত করা, জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাস্তবায়ন, ব্রাজিলসহ মারকোসুরের সঙ্গে আলোচনা এবং ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে বিএসটিআই ও ভারতের ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের পারস্পরিক স্বীকৃতি, ক্রেতা-বিক্রেতা প্রতিনিধি দল বিনিময় এবং চামড়া, ওষুধ ও পাট খাতে যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রথমে সনদ, পরে চুক্তি, এরপর বাজার দখল
সরকারের পরিকল্পনায় বাস্তবায়নের সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম বছরে বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ, পণ্যের সনদ যাচাই ও বাজার প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
এক থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। এরপর তিন থেকে সাত বছরের মধ্যে পোশাকের বাইরে রপ্তানিতে পূর্ণাঙ্গ বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে কাগজে কৌশল তৈরির পাশাপাশি বাস্তবে তা কতটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন, দ্রুত সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, প্রয়োজনীয় সনদ এবং কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতি একসঙ্গে নিশ্চিত করতে পারলেই নতুন বাজারে বাংলাদেশের অংশ বাড়ানো সম্ভব হবে।
/শান্ত/
