পুনঃক্রয় নিলামের মাধ্যমে সরকার ৬ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকার ট্রেজারি বন্ড কিনছে
সাম্প্রতিককালের মধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে সরকারি বন্ডের পুনর্ক্রয় নিলাম। এই পুনর্ক্রয় নিলামে সরকার ৬ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকার ২ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড কিনতে যাচ্ছে। আগামী ৮ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এই পুনক্রয় নিলাম অনুষ্ঠিত হবে।
অভ্যন্তরীণ বা দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া ঋণের ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে সরকার ২ বছর মেয়াদি এ্ই ট্রেজারি বন্ড কিনে নিতে যাচ্ছে সরকার। বিগত ১৭ বছরের মধ্যে এটিই হবে সরকারি বন্ড পুনর্ক্রয় (বাইব্যাক)-এর প্রথম কোনো উদ্যোগ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তাদের 'লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট অপারেশন' (এলএমও)-এর অধীনে এই বাইব্যাক বা পুনর্ক্রয় নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। এই নিলামের আওতায় থাকা বন্ডগুলোর বার্ষিক কুপন রেট বা সুদ ১২.৩০ শতাংশ, যেগুলোর মেয়াদ আগামী ৬ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা।
নিলামের প্রক্রিয়া অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা যে দামে তাদের কাছে থাকা বন্ড সরকারের কাছে ফেরত বিক্রি করতে চান, তা উল্লেখ করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র (বিড) জমা দেবেন। পরবর্তীতে এগুলো পর্যালোচনা করে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে যে কোন অফারগুলো গ্রহণ করা হবে।
এর আগে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ সরকারি সিকিউরিটিজ পুনর্ক্রয় করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন প্রথম দিনেই চারটি বেসরকারি ব্যাংক এবং একটি অসংবিধিবদ্ধ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫০৩ কোটি টাকার দরপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার মূলত সরকারের ঋণ পরিশোধের দায় বিভিন্ন সময়ে ভাগ করে দেওয়া এবং মেয়াদপূর্তিতে একবারে বিপুল অংকের অর্থ পরিশোধের চাপ এড়াতেই বন্ডগুলো কিনে নেওয়া হচ্ছে। একসাথে বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের চাপ কমাতেই সরকারের এই উদ্যোগ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগেই বন্ড কিনে নিলে সরকারের সুদজনিত ব্যয় কিছুটা কমবে। ফলে কার্যকর বা প্রকৃত সুদের হার বন্ডের কুপন রেট ১২.৩০ শতাংশের চেয়ে কম পড়বে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, "এই বাইব্যাক নিলাম ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন তারল্য সঞ্চার করবে, যা ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মুনাফার হারের (ইয়েল্ড) ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি করবে। এতে সরকার ভবিষ্যতে কম সুদে অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবে।" এর ফলে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণও কমবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এটি একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "এ ধরণের নিলাম করে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখতে চাচ্ছে যে মার্কেট কিভাবে কাজ করে। কারণ এ ধরণের চর্চা মার্কেট অরিয়েন্টেড কিনা, সেটা দেখার বিষয় রয়েছে। তিনি জানান, গত এপ্রিল মাসে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদের হার বেশি ছিল, তাই সেই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বাইব্যাক নিলামে যায়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপর এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, ৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকার নিলামের ঘোষনা দিলেও, এত পরিমাণ অর্থ নেওয়া হবে না। বাজারদর বা ইল্ডের ওপর নির্ভর করে এর চাইতে আরো কম পরিমাণ বন্ডও নেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নোটিশ অনুযায়ী, প্রাথমিক ডিলার (প্রাইমারি ডিলার) ব্যাংকগুলো সরাসরি এই নিলামে অংশ নিতে পারবে। তবে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাইমারি ডিলারের মাধ্যমে দরপত্র জমা দিতে পারবে। গৃহীত বন্ডের মূল্যের পাশাপাশি নিষ্পত্তি বা সেটেলমেন্টের তারিখ পর্যন্ত অর্জিত সুদ পরিশোধ করবে সরকার।
বন্ড বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "বাংলাদেশের সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারের জন্য এই বাইব্যাক ব্যবস্থা একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এটি সরকারকে তাদের ঋণের ব্যয় এবং (বন্ডের) মেয়াদের ভারসাম্য আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি এটি ট্রেজারি বন্ডধারীদের পোর্টফোলিও পুনঃপুনর্বিন্যাস বা বন্ড বিক্রি করে তারল্য পাওয়ার বাড়তি সুযোগ তৈরি করে দেবে।"।
তাদের মতে, এই বন্ড পুনর্ক্রয় প্রক্রিয়ায়ূ বাজারে তারল্য বাড়াবে এবং সুদের হার কম থাকবে। এর মাধ্যমে সরকার কম সুদে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে সক্ষম হবে।
