অনুমতি ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো ছবি, ভিডিও ও তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা বন্দর কর্তৃপক্ষের
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে পূর্বানুমতি ছাড়া বন্দর-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও ও পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশ বা প্রচার না করতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছে। একই সঙ্গে এই নির্দেশনার আইনি ভিত্তি ও এটি জারির সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কর্তৃপক্ষ বন্দর ব্যবহারকারী ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্বানুমতি ছাড়া বন্দরের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম, নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও, নকশা ও পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশ বা প্রচার না করার নির্দেশ দিয়েছে।
নোটিশে বিশেষভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গণমাধ্যমের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ এবং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর অধীনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম স্বাক্ষরিত নোটিশটি বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক ও ব্যুরোপ্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এ নির্দেশনা জারির সময়টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ১৫ বছরের জন্য বিদেশি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এরই মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
আন্দোলনকারীরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তারা তাকে 'ডিপি ওয়ার্ল্ডের এজেন্ট' হিসেবে কাজ করার অভিযোগও করেছেন। আগামী ১৩ অক্টোবর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও এবং তাকে কার্যালয় থেকে বের হতে না দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন তারা।
এমন পরিস্থিতিতে বন্দর-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশে হঠাৎ করে আরোপ করা এই বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে- এটি কেবল নিরাপত্তার ব্যবস্থা, নাকি এর ফলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশও প্রভাবিত হতে পারে।
সংবেদনশীল এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা এবং প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে- এমন তথ্য সুরক্ষিত রাখার ক্ষমতা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
তবে বন্দর-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও ও পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশের আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা আইনগতভাবে কতটা যৌক্তিক এবং এটি একটি সার্বিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে কতটা বৈধ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বন্দরটি এমনিতেই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। একই সময়ে নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে কনটেইনার হারিয়ে যাওয়া এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে পণ্যবোঝাই কনটেইনার বন্দর ফটক দিয়ে বের করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়েও বাস্তবিক কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, বন্দরের বড় একটি অংশ বন্দরসংলগ্ন উঁচু উড়ালসড়ক থেকে দৃশ্যমান।
সিপিএ বলছে, সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিচালনাগত ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতেই এই বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা অবশ্যই যে ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য নেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নির্দিষ্ট ও আনুপাতিক হওয়া উচিত।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য জাফর আলম বলেন, বন্দরে এমন কোনো গোপন কার্যক্রম পরিচালিত হয় না, যার কারণে ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট প্রয়োগ করার প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি বলেন, 'বন্দর একটি বহু পক্ষের অংশগ্রহণে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধি ও কর্মীরা দিনরাত কাজ করেন। আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে 'অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩' বন্দরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।'
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বন্দর কর্তৃপক্ষের এই নির্দেশনাকে অগণতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি বলেন, 'বন্দর নিয়ে আমরা যে ষড়যন্ত্রের কথা মনে করি, তা নিয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ। এই উদ্যোগ মূলত সেই জনঅসন্তোষের খবর প্রকাশ ঠেকানোর উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে।'
তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে নেওয়া যেকোনো প্রকৃত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে তার কমিটি সমর্থন করবে। কিন্তু আমরা মনে করি, সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ হলো বন্দরকে বাইরের প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও যুদ্ধসংশ্লিষ্ট স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে- এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।
তিনি অভিযোগ করেন, এসব উদ্বেগের সমাধান না করে কর্তৃপক্ষ স্বাধীন গণমাধ্যমের কাজে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, 'জনগণের ওপর এ ধরনের নির্দেশনা জারি করার অধিকার কারও নেই।'
সুতরাং মূল প্রশ্নটি চট্টগ্রাম বন্দরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা উচিত কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো- বন্দর-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও বা পরিচালনাগত তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের আগে কর্তৃপক্ষ কি আইনগতভাবে পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করতে পারে এবং কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় এত বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা আদৌ প্রয়োজনীয় কি না।
কোন তথ্যকে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে এই নির্দেশনা সাংবাদিকদের মধ্যে তারা কী প্রকাশ করতে পারবেন আর কী পারবেন না- তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার নিয়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
- কেআর
