মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন, হুথি হামলার পরও কেন নীরব তুরস্ক-পাকিস্তান?
সংগৃহীত ছবি
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে গত মাসে সই হওয়া মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথি সেনাদের সাম্প্রতিক হামলার মুখে সৌদি আরবের পাশে জোটটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক পদক্ষেপ না আসায় বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
মক্কা চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ কারণে চুক্তিটিকে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। কিন্তু সৌদি আরব যখন হুথিদের হামলার মুখে পড়ছে, তখন তুরস্ক ও পাকিস্তান সামরিকভাবে পাল্টা ব্যবস্থা না নেওয়ায় চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সৌদির জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক এলাকায় হুথিদের হামলার পর বিশেষভাবে আলোচনায় আসে, নতুন এই প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য তুরস্ক ও পাকিস্তান রিয়াদের সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসবে কি না। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ইয়েমেনের উপকূলের কিছু অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার দাবি এবং সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট
পাইপলাইনে হামলার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। ওই পাইপলাইনের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ৪ শতাংশ তেল সরবরাহ পরিবহন করা হয়।
তবে মক্কা চুক্তিকে এখনই ব্যর্থ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ তুর্কি কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, চুক্তির প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার এখনো আইনগতভাবে কার্যকর হয়নি।
ওই কর্মকর্তা জানান, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে ৩ দেশকেই নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তুরস্কে চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য শিগগিরই উপস্থাপন করা হতে পারে। পাকিস্তানকেও সংসদের অনুমোদন নিতে হবে। অন্যদিকে সৌদি আরব রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে চুক্তিটি অনুমোদন করতে পারবে।
তুর্কি কর্মকর্তার ভাষ্য, এটি শুধু একটি নিরাপত্তা জোট নয়, ৩ দেশ মিলে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই পূর্ণাঙ্গ যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হয়ে যাবে এমনটি প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও হুমকি মূল্যায়ন, পারস্পরিক পরামর্শ, সামরিক সমন্বয় এবং যৌথ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার মতো বিভিন্ন কাঠামো তৈরি করতে হবে বলে জানান তিনি। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।
ইতোমধ্যে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ৩ দেশ এই সিদ্ধান্ত নেয়। শুরুতে ৩ বছরের জন্য একজন পাকিস্তানি মহাসচিব নেতৃত্ব দেবেন।
তিন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বা ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ তৈরিতেও সময় প্রয়োজন হবে বলে জানান ওই তুর্কি কর্মকর্তা। তাঁর মতে, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব আগে আলাদাভাবে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিলেও ৩ দেশ একসঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সামরিক মহড়া পরিচালনা করেনি।
চুক্তির প্রতিরক্ষা ধারা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট করেছেন তিনি। কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পাল্টা হামলা শুরু হবে না। আক্রান্ত দেশ সহযোগিতা চাইলে ৩ দেশের মধ্যে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
তুর্কি কর্মকর্তার মতে, মক্কা চুক্তির উদ্দেশ্য প্রতিটি হামলার পর তাৎক্ষণিক সামরিক জবাব দেওয়া নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা, যাতে সম্ভাব্য সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই তা ঠেকানো সম্ভব হয়।
