হাম নির্মূলের সনদ পাওয়ার বছরে মৃত্যু ছাড়ালো হাজার, দায় কার?
দেশে হাম ও উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে এই তথ্য জানা যায়। এতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮ টা থেকে বুধবার সকাল ৮ টা পর্যন্ত) দেশে হাম উপসর্গে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে দেশে হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ১ হাজার ২ জন।
বাংলাদেশ এই বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে রয়েছে। বুধবার পর্যন্ত দেশে উপসর্গ ও নিশ্চিত মিলিয়ে হাম রোগীর সংখ্যা হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪। আগের বছরগুলোয় এই চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালে রোগী শনাক্ত হয়েছিলো ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২, ২০২২ সালে ৩১১ জন। ২০২৫ সালে দেশ থেকে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৬ সালে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়া যেতো।
হামে এত মৃত্যু আমার জানামতে এই দেশে আগে হয়নি। এত সংক্রমণও হয়নি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, এর শিকার হলো শিশুরা।
- মাহমুদুর রহমান, সাবেক পরিচালক (আইইডিসিআর)
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা দেওয়ার কাজে চরম অবহেলা করা হয়। চলতি বছরের শুরু থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি সরকার। মার্চ থেকে হাম বাড়তে শুরু করে ব্যাপকভাবে। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে মে জুড়ে চলে গণটিকাদান। সেই সময়ও প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকা থেকে বাদ পরে যায়।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১১৯ শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত এই পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেছিলেন, ‘হামে এত মৃত্যু আমার জানামতে এই দেশে আগে হয়নি। এত সংক্রমণও হয়নি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, এর শিকার হলো শিশুরা।’
টিকাদানে ঘাটতি, সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতি
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এই ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিলো। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।
২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিলো। সেবার কভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
২০২০–২০২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।
টিকা দেওয়ার পর এত সংক্রমণ ও মৃত্যু নজিরবিহীন
এবার প্রাদুর্ভাবের পর গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করে, কিন্তু তাতেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। কারণ, হামের টিকা দিতে এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হয়, কিন্তু গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে আওতায় আনা হয়।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী আজ বলেন, টিকাদানের পর এত সংক্রমণ সত্যিই নজিরবিহীন। এতে বিপুলসংখ্যায় শিশু বিপদে পড়েছে। এখন ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সের শিশুদের টিকার ব্যবস্থা করতে হবে।
//ইমরান//
