প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রকে মনোযোগ দিতে হবে
‘বার্ধক্য’ মানবজীবনের একটি অনিবার্য ও স্বাভাবিক পর্যায়। কিন্তু পরম পরমায়ু বৃদ্ধির এই আধুনিক যুগে দীর্ঘায়ু লাভ যতোটা উদ্যাপিত হয়, সেই দীর্ঘ জীবনের মান ও নিরাপত্তাতোটা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ বর্তমানে এক ঐতিহাসিক জনমিতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দ্রুত হ্রাস পাওয়া জন্মহার এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অথচ এই জনমিতিক পরিবর্তনের সমান্তরালে দেশের স্বাস্থ্য খাত, সামাজিক সুরক্ষা অবকাঠামো এবং পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তুত করা যায়নি। বিশেষ করে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাটি আজ এক গভীর কিন্তু নীরব সংকটে রূপ নিয়েছে।
২০২৬ সালের জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৮% কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন। বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ, স্মৃতিবিভ্রাট কিংবা শারীরিক উপসর্গের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা না পাওয়ার হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। এ প্রেক্ষাপটে প্রবীণ মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্কট ও তার কার্যকর সমাধানের পথ অনুসন্ধানে পাঁচটি মৌলিক দিক বিশদ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
১. মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রাদুর্ভাব ও গভীর চিকিৎসা-ঘাটতি
বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মানসিক রোগ সংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশের ১ কোটি ৬০ লাখ প্রবীণ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৮.০ শতাংশের বর্তমান মানসিক রোগের চিকিৎসাগত লক্ষণ বিদ্যমান। এর মধ্যে বিষণ্নতায় আক্রান্ত ১১.৬ শতাংশ, উদ্বেগজনিত রোগে ৪.৮ শতাংশ এবং স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার মতো জ্ঞানীয় সমস্যায় আক্রান্ত ২.৩ শতাংশ। উদ্বেগের চূড়ান্ত চিত্রটি উঠে আসে তাদের চিকিৎসা গ্রহণের হার দেখলে—মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত প্রবীণদের মাত্র ৫.১ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে পেশাদার চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রবীণ কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক সেবা ছাড়াই দিনাতিপাত করছেন। এর পেছনে মূল কারণ হলো মানসিক রোগ সম্পর্কে সামাজিক কুসংস্কার, এটিকে বার্ধক্যের ‘স্বাভাবিক নিয়ম’ বলে অবহেলা করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ততা।
২. একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা ও পারিবারিক কাঠামোর রূপান্তর
এককালে যৌথ পরিবার ছিল প্রবীণদের আবেগীয় ও সামাজিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। কিন্তু আধুনিক নগরায়ণ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কর্মসংস্থানের তাগিদে সন্তানদের দূরে বসবাস বা বিদেশ গমন এবং একক পরিবারের প্রসারের ফলে সেই ঐতিহ্যবাহী যত্নব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা যায়, প্রবীণদের মধ্যে ৫৮% বিষণ্নতা, ৮২% উদ্বেগ এবং ৭৭% অনিদ্রার উপসর্গে ভুগছেন। জীবনসঙ্গীর প্রয়াণ, সমবয়সীদের হারিয়ে ফেলা ও অবসরগ্রহণের পর সামাজিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা মহামারী আকারে দেখা দিচ্ছে। সামাজিকভাবে নিষ্ক্রিয় প্রবীণদের মধ্যে এই একাকিত্বের প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক, যা কেবল মানসিক স্বাস্থ্যই নয়, তাদের দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগকেও দ্রুত জটিল করে তোলে।
৩. আর্থিক নির্ভরশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধির দ্বৈত চাপ
বার্ধক্যে আয়ের নিজস্ব উৎস কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রবীণদের মানসিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল করে ফেলে। চিকিৎসাব্যয়, নিয়মিত ওষুধের খরচ এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে পরিবারের ওপর আর্থিক নির্ভরশীলতা তাঁদের মনে এক ধরনের অপরাধবোধ ও স্বনির্ভরতা হারানোর যন্ত্রণা তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন অর্থনৈতিক অবস্থা প্রবীণদের বিষণ্নতা ও উদ্বেগের সরাসরি অন্যতম প্রধান অনুঘটক। অন্যদিকে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ব্যাধি এবং চলাফেরার সীমাবদ্ধতা তাঁদের দৈনন্দিন স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। ফলে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা এবং শারীরিক অক্ষমতা—এ দুয়ের সম্মিলিত প্রভাব তাঁদের তীব্র মানসিক চাপের মুখে ঠেলে দেয়।
৪. স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সরকারি কাঠামোর চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় এখনো অত্যন্ত সীমিত। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে চিকিৎসাসংক্রান্ত ঘাটতি যেখানে ৯১ শতাংশ, সেখানে প্রবীণদের জন্য ডেডিকেটেড বা বিশেষায়িত জেরিয়াট্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা দেশে নেই বললেই চলে। যদিও বর্তমান সরকার মানসিক স্বাস্থ্য আইন ও ই-হেলথ কার্ড, স্বাস্থ্য আইডি এবং স্বাস্থ্যবীমার মতো বিভিন্ন কল্যাণমুখী নীতি গ্রহণে তৎপরতা দেখাচ্ছে, তবু বিপুল চাহিদার বিপরীতে স্বাস্থ্য খাতের সুশাসন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ জনবলের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, সরকারি সেবাকেন্দ্রে দায়িত্বরত স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ‘সেবাধর্মী মানসিকতা’ নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
৫. উত্তরণের সমন্বিত রূপরেখা: জেরোন্টোলজিক্যাল মডেল
প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কেবল ওষুধ বা চিকিৎসানির্ভর উপায়ে দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য একটি বহুমুখী ও আধুনিক সমন্বিত অবকাঠামো প্রয়োজন। কার্যকর ভবিষ্যৎ কাঠামোটি হতে হবে—‘শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা + মানসিক স্বাস্থ্যসেবা + সামাজিক যত্ন + পারিবারিক সহায়তা + সামাজিক নিরাপত্তা + পুনর্বাসন + জেরোন্টোলজিক্যাল সমাজকর্ম।’
বিশেষায়িত সেবা কর্নার: দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য পৃথক সেবা কর্নার ও মানসিক সুস্থতা বুথ স্থাপন করতে হবে।
সামাজিক ও শারীরিক সক্রিয়তা: কমিউনিটি পর্যায়ে প্রবীণদের নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ ও পছন্দের শখে যুক্ত রাখার জন্য সামাজিক ক্লাব বা সিনিয়র সেন্টার গড়ে তুলতে হবে।
ই-হেলথ কার্ড ও বীমা সুরক্ষা: প্রবীণদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যবীমা ও ই-হেলথকার্ডের আওতায় এনে নিখরচায় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
জেরোন্টোলজিক্যাল সমাজকর্ম: প্রবীণ পরিচর্যায় দক্ষ সমাজকর্মী, নার্স ও কাউন্সেলরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ঘরে ঘরে সামাজিক সেবা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রবীণত্ব কোনো ব্যাধি নয়, বরং জীবনের এক পরিণতিপ্রাপ্ত অধ্যায়। একটি সভ্য সমাজের আসল পরিচয় ফুটে ওঠে তার জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের তারা কীভাবে মূল্যায়ন করছে এবং তাদের জীবনের শেষ দিনগুলো কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করছে তার ওপর। বাংলাদেশে প্রবীণ মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কটকে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় এনে সরকার, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি একটি সমন্বিত ও সংবেদনশীল কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবেই আমাদের প্রবীণরা সুস্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারবেন।
