বণিক বার্তার আলোচনায় বক্তারা বৈষম্য নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি
এখানে কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানি সব খাত নিয়ন্ত্রণ করছে আর কৃষকরা অস্তিত্ব সংকটে রয়েছেন।
প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ৯:১৫:১৯
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো অলিগোপলির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানে কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানি সব খাত নিয়ন্ত্রণ করছে আর কৃষকরা অস্তিত্ব সংকটে রয়েছেন। সরকারের উদ্যোগের অভাবে দুর্নীতি এবং সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটছে। ফলে বেড়েছে লুটপাট ও দখল বাণিজ্য। অন্তর্বর্তী সরকার প্রকৃত পরিবর্তন ও বৈষম্য দূর করার জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। সরকারের প্রতি জনগণের আশা ক্রমেই কমছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে আতঙ্ক এবং ভয়ও বিরাজ করছে। কৃষি, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে বৈষম্য প্রকট। সরকার শুধু কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। প্রকৃত বৈষম্য দূরীকরণে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
গতকাল বণিক বার্তা আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও বৈষম্যহীন রূপান্তরের পথ অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। বণিক বার্তার সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির যে কথা বলা এটি একটি মিথ। পৃথিবীতে মাত্র ৮-১০টি কোম্পানি সব খাত নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশেও একই রকম। এখানে কৃষক মার খেয়ে যাচ্ছে, আবার অলিগোপলিরা থামছে না। এক্ষেত্রে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি, সম্পদ কেন্দ্রীভূত করছে। আর সেটি করতে গিয়ে লুটপাট এবং দখল বাণিজ্য করে। এটাই বাংলাদেশের পুঁজিবাদের ধরন। বৈষম্যহীন অর্থনীতি তৈরি করতে সরকার কিছু উদ্যোগ নিতে পারত। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে পারত। কৃষি বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, সে জায়গা থেকে সরকার অনেক দূরে। ক্রমান্বয়ে তারা প্রত্যাশা থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছে। সবকিছু আগের মতোই হচ্ছে। এখন পাইকারি হারে মামলা হচ্ছে। মানুষ আতঙ্কে আছে। অথচ শেখ হাসিনাসহ যাদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার হওয়ার কথা ছিল সেভাবে কিন্তু আমরা দেখছি না। সরকার এখনো নিহত, আহতদের তালিকা করতে পারেনি।’
বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, ‘সাত মাসের অভিজ্ঞতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। সবার অংশগ্রহণে এ অভ্যুত্থান হয়েছে। আন্দোলনে সামনের সারিতে যারা ছিলেন, তাদের জন্য সবাইকে একটি জায়গায় রাখা ছিল চ্যালেঞ্জ। ওই নেতৃত্বটা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু সেটা না করে তারা সরকারে অংশ নিল; এটি কতটুকু সুবিচার হয়েছে সেটা প্রশ্ন রাখে। আগস্টে তাদের প্রতি যে বিশ্বাস ও অগাধ ভালোবাসা ছিল, সেখানে এ সাত মাসে কোনো ঘাটতি তৈরি হয়েছে কিনা। ১৫-২০ বছর ধরে যারা আমলাতন্ত্রের মধ্যেই নেই, ভুক্তভোগীর জায়গা থেকে তাদের আবার নিয়োগ করা কতটা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটাও একটা প্রশ্ন। এ প্রশ্নগুলোর মীমাংসা না করে বাংলাদেশের জন্য একটি স্থায়ী অবস্থানে যাওয়া কঠিন বলে মনে করি।’
লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের কথা বলছে, কিন্তু কোথায় সংস্কার করা হচ্ছে সেটি আমরা দেখছি না। এ অভ্যুত্থান হয়েছিল কর্মসংস্থানমুখী একটি আন্দোলন থেকে। কিন্তু গত সাত মাসে কয়টি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে? আমি দেখিনি। দেশে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার কৃষক, শ্রমিক ও দলিতরা। গত সাত মাসে তাদের নিয়ে কোথাও আলোচনা হয়নি। দেশের সবচেয়ে বড় খাত হলো কৃষি। অথচ সেখানে আলাদা একজনকে দায়িত্ব দিতে পারল না। কৃষিতে এক ধাপও আগাতে পারিনি আমরা। অথচ জ্বালানি তেলের দাম আমরা কমাতে পারিনি। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিলেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। একদিকে বাজার সিন্ডিকেট থাকল অন্যদিকে কৃষি খাতকে চূড়ান্তভাবে উপেক্ষা করা হলো। সরকার শ্রম খাতকে সংস্কার করতে একটি কমিশন গঠন করল। তারা এখনো সুপারিশ দিতে পারেনি। সুপারিশ চূড়ান্ত না হলেও অনেক কিছু করা যায়। শ্রম খাতের প্রথম প্রয়োজন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ। সেটিতে কোনো পদক্ষেপ নেই।’
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘আগে আইনকে ফাঁকি দিয়ে টাকা বানানো হতো। আইনের চোখে অপরাধ, এ ধরনের কাজও করা হতো। কিন্তু ক্রমশ আইন নিজে লুণ্ঠনের জন্য কিংবা লুণ্ঠনকে জবাবদিহিহীন করার জন্য কিংবা লুণ্ঠনকেই অর্থনীতি হিসেবে চালু করার জন্য এখানকার সাংবিধানিক শক্তি, সংসদ ও বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে।’
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক কল্লোল মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘দেশের ১০ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে ৪১ শতাংশ আয়। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির কারণ প্রাকৃতিক বা অবশ্যম্ভাবী নয়। বরং বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণেই তা ঘটেছে। বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা, প্রত্যক্ষ করছাড় ও কর ফাঁকিই এ অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব নেয়ার পর এ পথ থেকে ফিরে আসেনি। বিরাজমান বৈষম্য কমাতে চাইলে সরকারকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধনিক শ্রেণীর কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আহরণ বাড়াতে হবে, শুল্ক ও ভ্যাটের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পরোক্ষ কর আহরণ কমাতে হবে, ভূমি সংস্কার করে বাড়তি জমি ভূমিহীন কৃষকের মাঝে বণ্টন করতে হবে, কৃষি উপকরণের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, উৎপাদিত ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বেঁধে দিতে হবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষিপণ্য সরাসরি ক্রয় করতে হবে এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে টাস্কফোর্সের যে প্রতিবেদন বেরিয়েছে, সেখানে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেছেন, আমাদের দাম না কমিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা কমাতে হবে। এ ধরনের প্রস্তাবগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে কী করা প্রয়োজন, তা নিয়ে দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বৈষম্য দূর করা ও জন-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হওয়ার দিকনির্দেশনা থাকার কথা ছিল টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে। কিন্তু সেগুলোর কিছুই হয়নি।’
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও সাংবাদিক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদলে কিছু কমন ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি। আরেকটা দিক হলো বেসরকারি খাত, যারা অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রক। বেসরকারি খাতে শীর্ষে যারা থাকে, তারাই আমদানি থেকে শুরু করে পুরো অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যবসার সঙ্গে ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠন, জ্বালানি খাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রায় আগের মতোই রয়েছে। এর বাইরে দ্বিতীয় স্তরে মাঝারি ব্যবসা বা শিল্প এক ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে হস্তান্তর হয়। এখানে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও নীরব অংশীদার থাকে। যখন যার দল ক্ষমতায় আসে, তখন তার কাছে শান্তিপূর্ণভাবে তা হস্তান্তর হয়। কিন্তু যারা আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে অলিগার্করা এখনো আগের মতোই রয়েছে। সেখানে কোনো পরিবর্তন এখনো হয়নি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনই একমাত্র নির্ধারক। আগের সরকার কোনো কিছুই কেয়ার করেনি। বিদ্যুৎ ও ব্যাংকের ক্ষেত্রে আইন করেই লুট করেছে। লুটের জন্য তাত্ত্বিকভাবে রিশিডিউল করে আইন করা হয়েছে। এখন বৈষম্য দূর করার বিষয়ে আমরা আলোচনা করতে পারছি। কয়দিন পর এগুলো আলোচনায় আসবে না। কয়দিন পর বিভিন্ন পন্থীতে গ্রুপ তৈরি হবে। আর সেগুলো আমাদের মাঝে ঢুকিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।’
প্রথমেই গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কারগুলো করতে হবে উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘দেশে নির্বাচন হোক এটা আমরা চাই। তবে প্রথমে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে হবে। শুরু থেকে আমরা এ বিষয়ে কথা বলে আসছি। আইন উপদেষ্টা গণপরিষদ নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে একমত। বিএনপির তরফ থেকে যেহেতু নির্বাচনের চাপ রয়েছে, তাই তাদের সঙ্গে সংলাপ হওয়া দরকার। তাহলে সব রাজনৈতিক দল আস্থা ফিরে পাবে বলে মনে হয়। অর্থপূর্ণভাবে তাদের বোঝানো উচিত। আমরা একই দল-মতের নই, কিন্তু ন্যূনতম এজেন্ডা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারি। তবে কেন জানি আমরা সেখান থেকে পিছিয়ে আসছি। আমাদের মধ্যে এত ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব, হিংসা, বিদ্বেষ থাকলে তা আত্মঘাতী হবে।’
জাতীয় নাগরিক কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি সেলের সম্পাদক আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘১৯০৫ থেকে শুরু ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১, বাংলাদেশ সৃষ্টির যে ধাপগুলো রয়েছে, সবগুলোতেই বৈষম্যের চেতনা ছিল। সে প্রেক্ষাপটে ২০২৪-এর মূল চেতনাও ছিল অর্থনৈতিকভাবে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সংস্কারের যে উদ্যোগগুলো এসেছে, এগুলো যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে প্রাথমিকভাবে বৈষম্য নিরসনের একটা বড় ক্ষেত্র তৈরি করা যাবে। সংস্কারের ক্ষেত্রে ভূমি কাঠামোতে হাত দিতে হবে এবং স্থানীয় সরকারকে বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা দিতে হবে। স্থানীয় চাহিদার আলোকে সে যখন বাজেট প্রণয়ন করতে পারবে, তখন স্থানীয়ভাবে প্রতিটি অঞ্চল স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথ তৈরি হবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মেহেদী মামুন বলেন, ‘শিক্ষা বা চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়ায় আমাদের দায়বদ্ধতার জায়গাটা অনেক বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে শিক্ষার যে বৈষম্য, সেটা দূর হলে বাকি বৈষম্যগুলো অনেকটাই দূর হয়ে যাবে।’
