ব্যাটারিচালিত রিকশা: নিয়ন্ত্রণ নয়, বন্ধ হোক
সম্প্রতি বিপজ্জনক হারে বেড়ে যাওয়া ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সরকারের মন্ত্রী, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা বাহনটিকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন। এমনকি নির্দিষ্ট কারখানা নির্ধারণ, লাইসেন্স দেওয়া কিংবা সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একে রূপান্তর করার নানা পরিকল্পনার আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রকৌশলগত বিজ্ঞান, সড়কের চূড়ান্ত নিরাপত্তা ও সামাজিক ব্যবস্থার সার্বিক নিরিখে বাহনটিকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘আধুনিকায়ন’ করার চেষ্টা এক বিপজ্জনক ও অকার্যকর উদ্যোগ ছাড়া কিছুই নয়। নীতিমালার ছায়াতলে এই বিশৃঙ্খলাকে টিকিয়ে না রেখে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও মানুষের জীবন রক্ষা করতে বাহনটিকে কঠোরভাবে বন্ধ করাই একমাত্র যৌক্তিক সমাধান।
যারা ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজপথে রাখার পক্ষে যুক্তি দেন, তারা মূলত বাহনটির মূল বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত গলদটিকে এড়িয়ে যান। রিকশা মূলত একটি অতি হালকা অযান্ত্রিক বাহন। চালকের প্যাডেলচালিত একটি স্বাভাবিক রিকশার গতি যেখানে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে, সেখানে ব্যাটারি ও মোটর যুক্ত করার পর এর গতি পৌঁছায় ২৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার কিংবা তারও বেশিতে। যানবাহনের চাকার আকার, ফ্রেমের পুরুত্ব এবং ভূমির সঙ্গে বাহনের উচ্চতার ওপর ভিত্তি করে এর ভারসাম্য ও মধ্যাকর্ষণ শক্তি নির্ধারিত হয়। একটি হালকা ফ্রেমে অতিরিক্ত গতি যুক্ত হলে বাহনটির ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।

অধিক গতির কারণে সড়কের জরুরি মুহূর্তে চালক যখনই ব্রেক কষেন, তখনই হালকা ফ্রেম ও উচ্চ মধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রের কারণে রিকশাটি টাল সামলাতে না পেরে উল্টে যায়। এতে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী ও চালক হাত-পা হারিয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে অহরহ। প্রকৌশল বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, অযান্ত্রিক রিকশার কঙ্কালের ওপর উচ্চগতির মোটর বসানো আর গরুর গাড়িতে রেলের ইঞ্জিন জোড়া দেওয়ার চেষ্টা একই কথা। মোটরসাইকেলের চেইন বসিয়ে বা বুয়েটের সহায়তায় কারখানা নির্দিষ্ট করে ফ্রেমের এই প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক অসংগতি দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটি একটি বিজ্ঞানবিরোধী গোঁজামিল মাত্র।
অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণ বা মানবিকতার নামে প্রকারান্তরে এক বিশাল অবৈধ বাণিজ্য ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। সড়ক ও প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য এবং স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এই অবৈধ বাহনগুলোকে রাস্তায় চলার সুযোগ দিয়ে বছরে শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। তথাকথিত সুশীল সমাজ চালকদের প্রতি ‘কৃত্রিম দরদ’ দেখিয়ে এর সমর্থনে বক্তব্য দিলেও বাস্তবতার ভয়াবহতা বিবেচনায় তারা অন্ধ। মানবিকতার দোহাই দিয়ে একটি প্রাণঘাতী বাহনকে সড়কে ছেড়ে দেওয়া কোনো সচেতন সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। উপরন্তু, এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ ও অপচয় জাতীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকার যখন কিছু নির্দিষ্ট ফিডার রোডে বা অলিগলিতে এসব রিকশা চলাচলের সুযোগ দেওয়ার চিন্তা করে, তখন মূল সড়কগুলোতেও বাহনগুলোর অনুপ্রবেশ ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই আংশিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা রূপান্তরের প্রক্রিয়া কেবল বিশৃঙ্খলাকেই দীর্ঘস্থায়ী করবে। নীতিমালার অজুহাতে কোনো চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও বকচ্ছপ বাহনকে রাজপথে বৈধতা দেওয়া যায় না। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি নিষিদ্ধ ও বন্ধ ঘোষণা করাই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ।
