বাড়ছে হামে শিশুমৃত্যু: এই দায় কার?
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্য বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছিলো মূলত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে। দেশের স্বাস্থ্য খাত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের রূপান্তরের পর সম্প্রতি যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগের চরমসীমায় পৌঁছেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে এক নজিরবিহীন স্থবিরতা নেমে আসে। বিশেষ করে শিশুদের অত্যন্ত সংক্রামক রোগ ‘হাম’-এর টিকার সরবরাহ ও বিতরণে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার মাশুল এখন দিচ্ছে দেশের হাজার হাজার অসহায় শিশু।
পরিসংখ্যান ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পর দীর্ঘ সময় ধরে দেশে হাম-রুবেলা’র টিকার নতুন ডোজ এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে।

স্বাস্থ্য খাতের এই ভেঙে পড়া ব্যবস্থার পেছনে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত উদাসীনতা ও সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা। একটি দেশের প্রশাসনিক রূপান্তর ঘটা স্বাভাবিক, কিন্তু জনস্বাস্থ্যের মতো মৌলিক ও জরুরি বিষয়টি কোনোভাবেই স্থবির হতে পারে না। সরকার পরিবর্তনের পর মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের তদারকি না থাকা, টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং সময়মতো নতুন আন্তর্জাতিক টিকার চালান না আনার প্রশাসনিক জটিলতার কারণে হাজার হাজার শিশু টিকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় রাখতে হয়। বিগত দুই বছরে টিকাদানের এই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ায় দেশে বিরাট এক ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের এই সংকট কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, এটি এক ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
ইউনূসের সরকার যদি ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই অর্থনীতি বা প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতো, তাহলে আজ হয়তো এই প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হতে হতো না। রাজনীতি ও ক্ষমতা হস্তান্তরের টানাপড়েনে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বলির পাঁঠা বানানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে কোনো অজুহাত ছাড়া দেশব্যাপী নিখরচায় হামের জরুরি টিকাদান অভিযান জোরদার করতে হবে। অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রিতার নীতি পরিহার করে কোমলমতি শিশুদের জীবন বাঁচানোই এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
