বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও দেশে কেন বাড়ে?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে দিন এই নতুন দাম কার্যকর হয়, ঠিক সে দিনই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই (WTI) তেলের দাম বিগত ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, বিশ্ববাজারের এই নিম্নমুখী ধারার বিপরীতে দেশীয় বাজারে তেলের দাম বাড়ানোর আসল যৌক্তিকতা কোথায়?
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে সরকারের প্রধান যুক্তি ছিলো—পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্চ মাস থেকেই তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেলেও, সেই ঊর্ধ্বমুখী অবস্থা বেশি দিন টেকেনি। মাত্র তিন দিনের মাথায় (১৭ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরব ও ওমান তেল সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়ায় সংকট কেটে যায়। দাম কমে ১০৪.৫৯ ডলারে নেমে আসে।
২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমে যায়। অথচ সরকার এমন একসময়ে দাম বাড়ালো, যখন বৈশ্বিক বাজার নিম্নমুখী। ফলে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, এই মূল্য নির্ধারণে কি আদৌ সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বাজার-চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে?
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সাধারণ মানুষ ও বামপন্থী দলগুলোর মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সব নিত্যপণ্যের ওপর, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলবে। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, কম দামের কারণে জ্বালানি তেল প্রতিবেশী রাষ্ট্রে পাচার হওয়ার বড় ঝুঁকি থাকায় দাম বাড়াতে হয়েছে। এটি অনেকটা ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের’ প্রবাদের মতোই শোনায়।
২০২৪ সাল থেকে মাসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তেলের দাম সমন্বয় করা হলেও এর হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত অস্বচ্ছ। কোন সময়কালের গড়মূল্য বা কোন তারিখের বিনিময় হার ধরা হচ্ছে—তার কোনো পরিষ্কার তথ্য প্রজ্ঞাপনে থাকে না। ফলে এই পদ্ধতি জনগণের কাছে একধরনের ‘ব্ল্যাকবক্স’ বা প্রশ্নাতীত গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
অর্থনীতির বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনা টেনে আনা সরকারের পুরনো কৌশল। গত এপ্রিলে যখন পাকিস্তান, ভারত, নেপাল তেলসংকটে দাম বাড়িয়েছিলো, তখন সরকার দাবি করেছিলো বাংলাদেশ দাম অপরিবর্তিত রেখেছে।
পরবর্তী সময়ে বিশ্ববাজারের দাম কমলে পাকিস্তান ও ভুটানের মতো দেশগুলোতে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও বাংলাদেশের বাজারে সেই অনুপাতে দাম কমানোর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। যখন দাম বাড়াতে হয় তখন প্রতিবেশী দেশের উদাহরণ টেনে ‘আমরা এখনো কম বাড়িয়েছি’ বলা হয়, কিন্তু বিশ্ববাজার কমলে সেই নীতি আর মানা হয় না। এটি নীতিগত মানদণ্ড নয়, বরং একধরনের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক চাতুর্য।
এত বড় একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—যা কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করে—তা সবসময় নির্বাহী বিভাগের একতরফা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর জন্য কোনো সংসদীয় বিতর্ক, কমিটি পর্যালোচনা বা প্রকাশ্য গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয় না।
একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মূলত তিনটি কাজ করা উচিত:
সংসদীয় পর্যালোচনা: সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে মূল্যনির্ধারণী সূত্র ও উপাত্ত পর্যালোচনা করা।
রাজনৈতিক ঐকমত্য: দেশে ক্রিয়াশীল সব উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা।
স্টেকহোল্ডারদের মতামত: ভোক্তা, পরিবহন খাত ও ব্যবসায়ী সংগঠনের অভিমতকে গুরুত্ব দেওয়া।
নীতিনির্ধারকদের এটি মনে রাখা জরুরি—একটি সিদ্ধান্ত কেবল কারিগরি সূত্রে সঠিক হলেই যথেষ্ট নয়, তার রাজনৈতিক বৈধতাও থাকা দরকার। আর সেই বৈধতা একতরফা প্রজ্ঞাপনে নয়, আসে বিতর্ক, অংশগ্রহণ ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমেই।
